খুদে পড়ুয়াদের গল্প শোনাচ্ছেন আমতার দাদু-ঠাকুমারা
পৃথ্বীশরাজ কুন্তী: সূর্যবংশের রাজা ভগীরথ কীভাবে মর্ত্যে গঙ্গাকে এনেছিলেন সেই গল্পই একমনে শুনছিল অঙ্কিতা,শ্রীকান্ত,শৌভিকের মতো খুদেরা।গল্প পড়ার মতো গল্প শোনা বা শোনানো উভয়ই বঙ্গ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে গল্পপাঠের আসর।'শোলোক বলা কাজলা দিদি' হারিয়ে গেলেও, নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাতে নিয়ম করে বিদ্যালয়ে হাজির হচ্ছেন দাদু-ঠাকুমারা।রাজরাজার গল্প হোক বা গোপালভাঁড়, রূপকথার রাজকন্যের গল্প হোক কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী- চেটেপুটে তার স্বাদ আস্বাদন করছে খুদে শিক্ষার্থীরা।শিশুদের মধ্যে গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা ও নীতিবোধ গড়ে তুলতে এমনই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে আমতা-১ ব্লকের আওড়গাছি প্রাথমিক বিদ্যালয়।আমতার উপকন্ঠে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ পড়ুয়াই প্রান্তিক পরিবারের।নুন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবার।রূপকথার দুনিয়া অজানাই ওদের কাছে।পড়ুয়াদের তাই গল্পের আসরে সামিল করার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।এই বিশেষ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে 'ঠাকুমার ঝুলি,ঠাকুরদার ঝোলা'।প্রতি সপ্তাহে একজন করে অভিজ্ঞ গল্প 'দাদু' অথবা 'ঠাকুমা'কে আনা হয় 'ঠাকুমার ঝুলি'র আসরে।তাঁদের কেউ প্রাক্তন শিক্ষক,কেউ আবার সাহিত্যজগতের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।তাঁরা টিফিন ব্রেকে গল্প শোনান।
সতরঞ্জির মাঝে বসেন গল্প দাদুরা আর তার সামনে ভিড় জমায় উৎসুক খুদের দল।দাদু তাঁর ঝুলি থেকে বের করেন একের পর এক গল্পের ডালি।কোনোটা শেখায় নৈতিকতা আবার কোনোটা বা নির্ভীক হওয়ার সাহস জোগায়।বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রদীপ রঞ্জন রীত জানান,এটি একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি।শিক্ষারই অঙ্গ হিসাবে এই বিশেষ কর্মসূচি চলছে বেশ কয়েকমাস ধরে।শ্রোতা ও গল্পকথক উভয় পক্ষ থেকেই ভালো সাড়া পাওয়া গেছে।ইতিমধ্যেই তাপস ভুঁইয়া,শ্রাবণী মান্না,নিমাইচন্দ্র কাঁড়ারের মতো দাদু-ঠাকুমারা এই আসরে অংশ নিয়েছেন।প্রাক্তন শিক্ষক নিমাই চন্দ্র কাঁড়ার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন,'গল্পের ছলে খুদেদের শিক্ষাদান সত্যিই এক প্রশংসনীয় প্রয়াস'।শুধু রূপকথার গল্পই নয়,থাকে পরিবেশ চেতনার বিশেষ গল্প।পড়ুয়া মুকুল দোলুইয়ের কথায়,তাদের খুব আনন্দ দেয় দাদু-ঠাকুমারা গল্প বলার মাধ্যমে।থাকে ঈশপের গল্প,পঞ্চতন্ত্রের গল্প,ভ্রমণ কাহিনী,ইতিহাসের গল্প,বীর সংগ্রামের কাহিনী।কেবল পড়ুয়ারাই নন,আসরে অংশ নেন বিদ্যালয়ের রন্ধন কর্মীরা।তেমনই একজন রন্ধন কর্মী শ্যামলী আদকের কথায়,'মাঝেমধ্যে আমিও শুনতে বসি,বেশ ভালো লাগে'।দুই সহ-শিক্ষক সৌমেন মন্ডল ও প্রীতি চোঙদার জানান, পড়ুয়ারাই আমাদের আগামীর পথদ্রষ্টা।তাই তাদের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও গল্প বলার মধ্য দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ,পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা ও কুসংস্কারমুক্ত মন গড়ে তুলতে তাঁরা ধারাবাহিকভাবে এই আসর চালিয়ে যাবেন।শুভাশিস,অঙ্কিতা,মুকুলরা শুনবে আরও আরও রাবণ বধের মতো পৌরাণিক গল্প কিমবা পরিবেশের জন্য গ্রেটা থুনবার্গের অদম্য লড়াইয়ের গল্প। 🙏



Comments
Post a Comment